প্রাত্যহিক জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সর্বব্যাপী আধিপত্য এখন আর আলাদা করে আলোচনার খোরাক হয় না। বলা যায়, এ আধিপত্য প্রায় সবাই মেনে নিয়েছে। যার ফলাফল হলো প্রযুক্তি খাতে আরো বেশি বিনিয়োগ ও মুনাফা, যা কিনা রকেট গতিতে সম্পদ তৈরি করছে। সিএনবিসির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, হালে এআইয়ের বদৌলতে যে হারে নতুন বিলিয়নেয়ার তৈরি হচ্ছে, তা অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ সম্পদ সৃষ্টির এ ঢেউ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন এক অধ্যায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে প্রাত্যহিক ব্যবহারের স্তরে নিয়ে আসতে বড় ভূমিকা রেখেছে অ্যানথ্রোপিক, সেফ সুপার ইন্টেলিজেন্স, ওপেনএআই বা অ্যানিস্ফিয়ারের মতো স্টার্টআপগুলো। কোম্পানিগুলোর তহবিল সংগ্রহের দৌড় রীতিমতো অভাবনীয়, যা তাদের বাজারমূল্যকে নতুন উচ্চতা দিয়েছে।
সিবি ইনসাইটসের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে এআই জগতে ৪৯৮টি ‘ইউনিকর্ন’ কোম্পানি রয়েছে, যাদের প্রত্যেকের বাজারমূল্য ১০০ কোটি ডলার বা আরো বেশি। এ কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত আকার ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন বা ২ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার। এর মধ্যে ১০০টি কোম্পানির বয়স মাত্র তিন বছর। এছাড়া ১ হাজার ৩০০-এর বেশি স্টার্টআপের বাজারমূল্য ১০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরে শেয়ারবাজারের উল্লম্ফনে ভূমিকা রাখছে এনভিডিয়া, মেটা, মাইক্রোসফটের মতো এআই-সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধি। এছাড়া ডাটা সেন্টারে বিশাল বিনিয়োগ ও এআই প্রকৌশলীদের আকাশছোঁয়া বেতন মিলিয়ে এআই খাতে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি এক মাত্রায় পৌঁছে গেছে, যা অতীতের দুটি বৃহৎ প্রযুক্তি ঢেউকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাজারমূল্যের দ্রুত বৃদ্ধির সঙ্গে একদল নতুন বিলিয়নেয়ারের উত্থান হচ্ছে। গত মার্চে ব্লুমবার্গের দেয়া পরিসংখ্যান অনুসারে, চারটি বৃহত্তম এআই কোম্পানি কমপক্ষে ১৫ জন বিলিয়নেয়ার তৈরি করেছে, যাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ৩৮ বিলিয়ন ডলার। ওই প্রতিবেদনের পর আরো ডজন খানেক ইউনিকর্ন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা হয়েছে।
গত বছর ওপেনএআই ছাড়ার পর মিরা মুরাতি থিংকিং মেশিনস ল্যাব প্রতিষ্ঠা করেন। গত মাসে ২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল জোগাড় করেন তিনি, যা কোম্পানিটিকে ১২ বিলিয়ন ডলারের ভ্যালুয়েশন দিয়েছে। অ্যানথ্রোপিক ৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের জন্য আলোচনা করছে, যা তাদের ভ্যালুয়েশনকে ১৭০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে পারে। এর সিইও দারিও আমোদেই ও ছয় প্রতিষ্ঠাতা এখন মাল্টি-বিলিয়নেয়ারে পরিণত হয়েছেন। অন্যদিকে অ্যানিস্ফিয়ারের ২৫ বছর বয়সী প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মাইকেল ট্রুয়েল মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার কোম্পানির ভ্যালুয়েশন ৯ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৮-২০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছেন। বিলিয়নেয়ারের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ট্রুয়েল নিজেও।
ডট-কম যুগের মতোই এআইয়ের উত্থানও মূলত সিলিকন ভ্যালিতে কেন্দ্রীভূত। গত বছর সান ফ্রান্সিসকোয় ২ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের যত বাড়ি বিক্রি হয়েছে, তা অতীতের যেকোনো বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এমআইটির গবেষক অ্যান্ড্রু ম্যাক্যাফি বলেন, ‘এআই ঢেউ যতটা ভৌগোলিকভাবে কেন্দ্রীভূত, তা সত্যিই অবাক করার মতো। কারণ এখানেই টেক কোম্পানি গড়ে তোলা ও পরিচালনা করার দক্ষ লোক রয়েছে। আমি শুনেছি অনেকেই বলেছে, এখন সিলিকন ভ্যালির যুগ শেষ বা অন্য কোনো স্থানে হবে নতুন সিলিকন ভ্যালি। কিন্তু সিলিকন ভ্যালি এখনো সিলিকন ভ্যালি।‘
তবে তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতে এ সম্পদে তারল্য সৃষ্টি হলে এআই ধনীরা ডট-কম যুগের ধনীদের মতোই আচরণ করবে। শুরুতে অতিরিক্ত অর্থ নিজেদের পরিচিত নেটওয়ার্কের মধ্যে একই ধরনের প্রযুক্তি কোম্পানিতে বিনিয়োগ করবে। পরবর্তী সময়ে যখন একটি শিল্পে সম্পদ কেন্দ্রীভূত করার ঝুঁকি বুঝতে পারবে, তখন তারা সম্পদ ব্যবস্থাপনার দিকে ঝুঁকবে। এমনকি তারা এআই ব্যবহার করে সম্পদ ব্যবস্থাপনা শিল্পকে ব্যাহতও করতে পারেন। তবে শেষ পর্যন্ত কর, উত্তরাধিকার ও দাতব্যের মতো বিষয়ে পরামর্শের জন্য এআই ধনীরা ঐতিহ্যবাহী পেশাদার সম্পদ ব্যবস্থাপকদের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে।